স্বর্গরথের চাকায় ফুটো

লোকটা যখন বেঁচে ছিল,
তার খোঁজ কেউ রাখেনি।
মরে যেতেই পাড়ার মোড়ে
চারটে বক্তৃতা, ছ’খানা পোস্ট,
আর বারো রকম চোখের জল।
লোকটা বেঁচে ছিল,
তাই তার খোঁজ কেউ রাখেনি।

যে কাঁধে হাত রাখার সময় ছিল না,
সে-ই এখন কাঁধে খাটিয়ার ওজন মাপে।
যে ফোনটা ধরেনি কখনও,
সে লিখছে –
“অত্যন্ত ব্যক্তিগত ক্ষতি।”
ফুলের গন্ধে ঢেকে যায়
বেঁচে থাকার পচা অপমান।
ধূপের ধোঁওয়ায় মিলিয়ে যায়
অপেক্ষার বছরগুলো।

সবাই খুব ব্যস্ত –
কে কতটা শোক দেখাবে,
কার ছবিতে কতটা কালো ফিতে মানাবে,
কার কণ্ঠে কতটা ভাঙা স্বর বিশ্বাসযোগ্য শোনাবে।
এদিকে ওপরে শুনি
দেবতারা নাকি ফাইল গুনছে।
ভালো মানুষের ভিড় এত বেড়েছে যে
দরজায় লেখা –
“স্বর্গরথের চাকায় ফুটো,
ধীরে চলুন,
নাটক মেরামতের কাজ চলছে।”

মৃতেরা নাকি হাসে না –
ঠিক তা নয়,
তারা পরিহাসের হাসি হেসেই চলে।
চিতার আগুন পেরিয়ে,
ধূপের ধোঁওয়া আর ফুলের গন্ধের আড়াল থেকে
তারা দেখে,
কী আশ্চর্য দ্রুততায়
অবহেলা বদলে যায় অশ্রুজলে।
যে কণ্ঠ একদিন উত্তর পায়নি,
আজ তার নামে মাইক্রোফোন কাঁপে।
যে দরজায় কড়া নেড়েও
ফিরে গিয়েছিল নিঃশব্দ,
সেই দরজাতেই আজ
শোকের ভিড়।

এই পৃথিবীতে
মানুষের সবচেয়ে দামি গুণ
মরে যাওয়া।
বেঁচে থাকলে
সে কেবল অভ্যাস,
একটা সহজলভ্য উপস্থিতি,
একটা ‘পরে কথা বলি’,
একটা ‘সময় নেই’,
একটা অপঠিত বার্তা।
মরে গেলেই
সে স্মৃতি,
সে প্রেরণা,
সে ‘অসাধারণ মানুষ’,
সে প্রোফাইল ছবির কালো ফিতে,
সে দীর্ঘ ক্যাপশনের নৈতিকতা।
বেঁচে থাকলে কেউ তাকে দেখে না,
মরে গেলে সবাই দেখে –
নিজেদের।
নিজেদের অপরাধবোধ,
নিজেদের অনুপস্থিতি,
নিজেদের অক্ষম ভালোবাসা,
নিজেদের সামাজিক মুখোশ।

ছাই হয়ে যাওয়া মানুষটা
সবার আয়না হয়ে ওঠে।
আর সেই আয়নায়
যে যতক্ষণ তাকিয়ে থাকে,
ততক্ষণই তার শোক।
তারপর?
তারপর ফুল শুকিয়ে যায়,
Status হারিয়ে যায় নিচের scroll-এ,
কালো ফিতের জায়গায়
ফিরে আসে ছুটির ছবি,
নতুন রেস্তোরাঁ, সন্ধ্যার কফি।
চলে গেছে যে,
পরিহাসের হাসি হেসে বলে –
“আমাকে নয়,
তোমরা নিজেদেরই শবযাত্রায় হাঁটছো।
আমি তো শেষ দৃশ্যের আগেই
মঞ্চ ছেড়ে দিয়েছি।”

– তৃষিতা

Leave a comment